বাংলা ভাষার বর্ণ সংস্কার একটি প্রস্তাবনা


প্রত্যেক ভাষারই একটি আপন চলার পথ থাকে। সময় এবং সামাজিক প্রেক্ষিতকে বিবেচনায় এনে সে আপন পথ রচনা করে চলে। চলার সময় পথিপার্শ্ব থেকে আপন প্রয়োজনে প্রয়োজনীয় উপাদান আহরণ করে নিজের শ্রীবৃদ্ধি করতে করতে সে চলে। যার আহরণ ক্ষমতা যত বেশী সে হয় তত সমৃদ্ধ। সমৃদ্ধ ভাষার আরও একটি গুণ হল তার অপ্রয়োজনীয় উপাদান বর্জন করার ক্ষমতা। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ভাষার কোন উপাদান অপ্রয়োজনীয় হয়ে দেখা দিলে সেই অপ্রয়োজনীয় উপাদান যে যত তাড়াতাড়ি বর্জন করতে পারবে সেই ভাষার গতিশীলতা তত তাড়াতাড়ি বৃদ্ধি পাবে। ইংরেজী ভাষা সম্ভবত  এ দুটি গুণের অধিকারী বলে পৃথিবীতে গতিশীল ভাষা হিসেবে স্বীকৃত।
ভাষার হীনমন্যতা ভাষাকে না দেয় স্বেচ্ছায় আহরণ করতে না দেয় তার অপ্রয়োজনীয় জিনিসকে বর্জন করতে। ভাষার এই চরিত্র ভাষাকে রুদ্ধ প্রকোষ্টে আটকে রাখতে চায়। বাইরে আসতে দেয় না। অন্যের সাথে সংমিশ্রণের ফলে নিজের স্বকীয়তা হারানোর ভয়ে ভীত থাকে। তাই সে ভাষার জগতে রূপ-রস-গন্ধ-বর্ণ এর স্বাদ থেকে সে হয় বঞ্চিত। এক ঘরে হয়ে থাকতে থাকতে দিন দিন রুগ্ন থেকে  রুগ্নতর হতে থাকে। স্বাভাবিক বৃদ্ধির সুযোগ না পেয়ে আস্তে আস্তে তার অস্তিত্ব বিলীন হতে থাকে। ফলে কালের ব্যাপ্ত পরিসরে সে হারিয়ে যায় মহাকালের মহাবিবরে। এই উপমহাদেশের সংস্কৃত ভাষাকে সম্ভবত: এর পর্যায়ে ফেলা যায়।
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লোকদের একই বর্ণের উচ্চারণে ভিন্নতা লক্ষণীয়। যুক্ত বর্ণের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে দুটি বা তিনটি বর্ণের মিলনে যে একটি যুক্ত বর্ণ হলো এর চেহারাতে সংশ্লিষ্ট বর্ণ সমূহের কোনটিরই আকৃতি খুঁজে পাওয়া যায় না। কিছু কিছু যুক্তবর্ণ সম্বলিত শব্দ আছে যাদের আমরা উচ্চারণ করছি একভাবে কিন্তু লিখছি অন্য ভাবে। তাছাড়া কিছু কিছু নামহীন উদ্ভট
যুক্ত বর্ণ আছে যা বাংলা ভাষায় অবাঞ্ছিতের মত যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। না এগুলোর উপর কেউ প্রশ্ন রেখেছে না কেউ এগুলোকে বাদ দেয়ার চেষ্টা করেছে। ইত্যাকার কারণে বাংলাদেশের বাংলা ভাষাকে আরও সহজ করার মানসে এবং বাংলাদেশীদের উপযোগী করার জন্য এর বর্ণ সংস্কারের উপর নিজস্ব মতামত দেয়ার প্রয়াস পেয়েছি। এ ব্যাপারে সুধীজনের সুচিন্তিত মতামত একান্তই কাম্য।
বর্তমানে বিশ্বের উন্নত ভাষাগুলোর মধ্যে বাংলা ভাষা অন্যতম। এর একটি সুপ্রাচীন ইতিহাস আছে। এর যেমন আছে নির্ভীক চিত্তে বিভিন্ন ভাষা থেকে শব্দ গ্রহণ করে নিজ ভান্ডার বৃদ্ধির ইতিহাস তেমনি আছে নিজের অপ্রয়োজনীয় উপাদানের বর্জনের ইতিহাস। এছাড়া এর আরও একটি বিশেষত্ব হলো এর সংগ্রামী চেতনা। বিভিন্ন সময়ে এই ভাষাকে শত্রুরা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে অস্তিত্বহীন করার বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলনের মাধ্যমে ষড়যন্ত্রকে ধ্যুলিস্যাৎ করার ইতিহাস। শত্রুরা একবার বলছে এটি “প্রাকৃত” জনের ভাষা, এ ভাষায় কথা বললে রৌরব নামক নরকে যেতে হবে, এ ভাষার উপর কোন রূপ চর্চা করা যাবে না তাই সরকারী বিধি নিষেধ। একবার বলছে এটি সংস্কৃত ভাষার দুহিতা, একবার বলছে এ ভাষার বর্ণগুলো খুব জটিল তাই রোমান হরফে বাংলা ভাষা লেখার উদ্ভট প্রচেষ্টা। এসব ষড়যন্ত্রের বেড়াজাল ছিন্ন করে আজ বাংলা ভাষা স্বকীয়তায় মূর্তমান। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এরই জলন্ত প্রমাণ।
আজ থেকে আনুমানিক সাড়ে তিন হাজার বছর অর্থাৎ খৃষ্টপূর্ব প্রায় দেড় হাজার বছর আগের কথাই ধরা যাক। তখন বঙ্গ দেশে আদি বাঙ্গালীদের বসবাস ছিল। তারা এক প্রাচীন সভ্যতারও জন্ম দিয়েছিল। পশ্চিম ও উত্তর ভারতের ব্রাহ্মণ্যবাদীরা তাদেরকে ঘৃণা করত। কারণ তাদের শরীরের রং ছিল অনুজ্জল এবং তাদের মুখের ভাষা তারা বুঝতে পারত না। তাদের ভাষাকে তারা পাখির কিচির মিচির বলে নিন্দা করত। তারা তাদেরকে তাদের প্রজাকুলে পরিণত করে নিয়েছিল। তারা এমনও বলত যে যারা প্রাকৃতজনের ভাষায় কথা বলবে তাদেরকে রৌরব নামক নরকে বসবাস করতে হবে। এই ভাষার উপর চর্চ্চা করাকে উঁচু স্তরের লোকেরা নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল। কিছু কিছু লোক অতি গোপনে এ ভাষার চর্চা করত। এখানে উল্লেখ্য যে সেখানকার শাসকদের ভাষা ছিল রাজ ভাষা যা আসলে ছিল দেব ভাষা বা সংস্কৃত ভাষা। শাসকরা কিন্তু সংস্কৃত ভাষায় কথা বলত না। তারা কথা বলত তাদের মাতৃভাষায় যে যেখানকার সে অঞ্চলের ভাষায়। প্রকৃতপক্ষে সংস্কৃত ভাষা ভারতের কোন এলাকার মানুষেরই মাতৃভাষা ছিল ন।
ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী কর্তৃক ১২০৪ খৃষ্টাব্দে বঙ্গ বিজয়ের পর সামগ্রীক পরিস্থিতি এক নাটকীয় মোড় নিল। মুসলীম নৃপতিরা প্রথমেই তথাকথিত “প্রাকৃত জন” দেরকে দেশের প্রকৃতজন হিসেবে আপন করে নিল। তাদের মুখের ভাষাকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে ভাষার উপর নানা রকম বাধা নিষেধ তুলে নিল। ফলে ইতোপূর্বে যারা গোপনে তাদের ভাষার উপর চর্চ্চা করত তার প্রকাশ্যে চলে এল এবং মুসলিম শাসকদের আনুগত্য লাভ করল। আরবী, ফার্সি, উর্দ্দু, হিন্দি এই ভাষায় স্থান লাভ করে ভাষার কলেবর বৃদ্ধি পেতে লাগল এবং নানান চড়াই উতরাই এর মাধ্যমে বর্তমান বাংলা ভাষার রূপনিল। তা একমাত্র সম্ভব হয়েছে মুসলমান রাজা বাদশাহদের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতার কারণে।
বাংলা ভাষা-ভাষীদের সংখ্যার দিক থেকে এই ভাষা পৃথিবীতে ষষ্ঠতম ভাষা। এই ভাষায় রচিত সাহিত্যের উপর নবেল পুরষ্কার দেয়া হয়েছে চলতি শতাব্দীর গোড়ার দিকে। পরবর্তীতে এই ভাষা পেয়েছে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা। অবশ্য এই ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা দিতে গিয়েই বাংলাদেশের লোকেরা ঝরিয়েছে অঢেল রক্ত। ফল স্বরূপ ত্বরান্বিত হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। আজ বাংলাদেশ তার পূর্ণ স্বাধীন সত্তা নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে।
বলা হয়ে থাকে, বাংলা ভাষার ব্যবহৃত বর্ণমালার প্রত্যেকটি বর্ণই উচ্চারণের দিক থেকে খুবই বিজ্ঞানসম্মত। অন্যান্য ভাষার তুলনায় বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত অক্ষরের উচ্চারণ স্থানের কভারেজ অধিক। ফলে বিভিন্ন ভাষার বিভিন্ন শব্দ বাংলা ভাষায় উচ্চারণের কোন পরিবর্তন না করেই লেখা ও পড়া যায়। কিন্তু এ ভাষার বিভিন্ন যুগের লেখা (যতটুকু পড়েছি) পর্যালোচনা করলে দেখা যায় এর অর্জন ক্ষমতা দেখাতে গিয়ে এটি যতটুকু উদারতার পরিচয় দিয়েছে বর্জন করার ক্ষেত্রে সে রক্ষণশীলতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছে বেশী। এখানে অর্জন শব্দটি দিয়ে বুঝাতে চেয়েছি বিভিন্ন ভাষা থেকে শব্দ গ্রহণ করাকে আর বর্জন শব্দটি দিয়ে বুঝাতে চেয়েছি  যে সব বর্ণ উচ্চারণের দিক থেকে অপ্রয়োজনীয় হিসাবে দেখা দিচ্ছে সেগুলি বাদ দেয়াকে। অর্জন শব্দটির অর্থ এখানে ব্যাপক, বাংলা ভাষার বাইরেও এর বিচরণ ক্ষমতা আছে, কিন্তু বর্জন শব্দটি শুধুমাত্র বাংলা ভাষার বর্ণ সংস্কারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখছি।
প্রশ্ন উঠতে পারে বাংলা বর্ণমালা ওদের চিহ্নগুলির সংস্কার কি আদৌ প্রয়োজন আছে ? যদি থেকেই থাকে তাহলে তা কি পদ্ধতিতে সংস্কার সম্ভব ? প্রয়োজন অবশ্যই আছে এবং পদ্ধতিগত ভাবেই সংস্কার সম্ভব। বর্ণমালা সংস্কারের আবশ্যকতা এবং পদ্ধতি-চিহ্নিত করার ব্যাপারে যুুক্তি আর সে যুক্তি সংগত কিনা তা দেখার ভার পাঠকের উপর। এখানে বলে রাখা ভাল যে একটির উত্তর দিতে গিয়ে অপরটির উত্তরও একই সময় আপনা আপনি এসে যাবে। আলাদা আলাদাভাবে দেখানোর কোন প্রয়োজন পড়বে না।
ভাষা তার আপন নিয়মে চলে। সে নিয়ম খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বের করার দায়িত্ব ভাষাবিদ বা বৈয়াকরণগণের। ভাষা তার চলার কোন একক ভংগিকে নিয়মের অধীন করতে না পারলে ব্যতিক্রম হিসাবে চালিয়ে নেয়ার দায়িত্ব তাদেরই, ভাষার নয়। মুখের ভাষাকে লিখে প্রকাশ করার জন্য যে কতগুলি সংকেতিক চিহ্ন ব্যবহার করা হয় সেগুলিকে সে ভাষার বর্ণমালা বলে। এই বর্ণমালার প্রত্যেকটি বর্ণের উচ্চারণ মুখের বা ঠোটের এক একটি স্থানের সংগে সম্পর্কযুক্ত। এই পরিবর্তনশীল জগতে সময়ের পরিবর্তনের সংগে সংগে সব কিছুরই কিছু না কিছু পরিবর্তন হচ্ছে। ভাষার বেলাতেও তাই। আর মানুষের উচ্চারণ ক্ষমতার বিভিন্নতার কারণেও কোন কোন বর্ণের স্থিরকৃত উচ্চারণ স্থানেরও পরিবর্তন স্বাভাবিক। বিশেষ করে যে বর্ণ সমূহের উচ্চারণ স্থান কাছাকাছি সে বর্ণ সমূহের পারস্পরিক উচ্চারণ স্থান সমূহের অদল-বদল হওয়া স্বাভাবিক।
আমাদের সময় আমরা যখন বাল্য শিক্ষা বই হাতে নিয়েছি তখন আমরা পড়েছি বাংলা বর্ণমালাতে স্বরবর্ণের সংখ্যা ১২ টি। (অ, আ, ই, ঈ, উ, ঊ,ঋ, ৯, এ, ঐ, ও, ঔ), কার ছিল ১০ টি (া, ,ি ী,  ু ,  ূ ,  ৃ , ,ে ,ৈ াে, ৗে) এবং ব্যঞ্জন বর্ণ ছিল ৪০টি (ক, খ, গ, ঘ, ঙ, চ, ছ, জ, ঝ, ঞ, ট, ঠ, ড, ঢ, ণ, ত, থ, দ, ধ, ন, প, ফ, ব, ভ, ম, য, র, ল, ব, শ, ষ, স, হ, ড়, ঢ়, য়, ৎ, ং, ঃ, ঁ) বাল্য শিক্ষা শেষ করার কয়েক বছরের মধ্যে দীর্ঘ রি নামক বর্ণটি উদাও হয়ে গেল। আরও কয়েক বছর পর দেখা গেল যে য বর্গের ‘ব’ অক্ষরটির সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। এদের নাকি বাংলা ভাষায় আর কোন প্রয়োজন নেই। আগে বাড়ী লিখতে ‘ী’ কার লাগত এখন ‘’ি দিলেই চলে, শ্রেণীকে শ্রেণি লিখলে ভুল হয় না। অনুরূপভাবে ‘ঙ’ এবং ‘ং’ ; য, জ, ঝ; স ও ষ; ত এবং ‘ৎ’ এরাও নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখে একে অন্যের স্থান দখল করে আছে। তাই যদি হয় তাহলে বলব আমাদের সময় যখন চলেই গেছে তখন আমাদের কথা না হয় বাদ-ই দিলাম কিন্তু যারা সবে মাত্র শুরু করেছে বা করতে যাচ্ছে বা অদূর ভবিষ্যতে শুরু করবে তাদেরকে এই বাড়তি ঝামেলা পোহাতে হবে কেন ?
ব্যাপারটা পরিষ্কার করার জন্য আরও একটু ভেতরে যাই। প্রথমেই স্বরবর্ণের ঘরের দরজায় একদম নিকটে যে ‘অ’ , আ এবং া-কার আছে এই ৩ টি চিহ্নের দিক নজর দেই। এই ৩ টি চিহ্নের মধ্যে অ+া= আ, এভাবে সম্পর্ক স্থাপন করা যায়। অর্থাৎ ‘অ’ এর সঙ্গে া-কার যোগ করলেই ‘আ’ পেয়ে যাই। তাহলে আ উচ্চারনের জন্য স্বরবর্ণের ঘরে আলাদাভাবে ‘আ’ অক্ষরটির কোন প্রয়োজন নেই। তাহলে স্বরবর্ণের মোট সংখ্যা ১২টি থেকে ‘আ’ নামক বর্ণটি কমে গেল। এখন ‘অ’ এর সঙ্গে ‘া’ যোগ করলে যদি আ বর্ণটি পাওয়া যায় তাহলে ‘অ’ এর সঙ্গে ‘’ি কার যোগ করলে ও তো ‘ই’ এর মত উচ্চারণ বিশিষ্ট বর্ণ পাওয়া যাবে। অর্থাৎ +িঅ=অি=ই পাওয়া যাবে। তাহলে আলাদা ‘ই’ চেহারা বিশিষ্ট একটি আলাদা বর্ণ্যরে প্রয়োজন কি ? এভাবে অগ্রসর হলে আমরা স্বরবর্ণ ও কারগুলো এভাবে সাজাতে পারি।
অ+া=আ=আ এর মত উচ্চারণ                +েঅ=অে= এ এর মত উচ্চারণ      
+িঅ=ই= ই এর মত উচ্চারণ                +ৈঅ= অৈ=ঐ এর মত উচ্চারণ
অ+ী=ঈ= ঈ এর মত উচ্চারণ                +েঅ+া=আে= ও এর মত উচ্চারণ  
অ+ ু= অু= উ এর মত উচ্চারণ                অ+ৗ=অৗ=ঔ এর মত উচ্চারণ
উ এবং ঊ এর মধ্যে কথা বলার সময় উচ্চারণ গত তেমন কোন পার্থক্য না থাকার কারণে ‘ঊ’ কে বাদ দিলেও চলে। ‘ে ৗ’ এর প্রথম অংশটি বাদ দিয়ে শুধু শেষের অংশটি (ৗ) রাখলে লিখতে সহজ হবে। ‘ঋ’ কে রি দিয়ে প্রকাশ করা যায়। ‘ ৃ’ কার কে এখানে না রেখে এবং ‘ঃ’ এবং  ‘ ঁ ’ এর সঙ্গে আলাদা চিহ্ন হিসাবে দেখানো যায়। তাহলে ব্যাপারটা দাড়াল এই যে ১১টি স্বরবর্ণ ও ১০টি কার থেকে একটি স্বরবর্ণ (অ) ও ৮টি কার ব্যবহার করলেই চলে। অর্থাৎ স্বরবর্ণের ঘরের মোট ২১টি চিহ্নের পরিবর্তে মাত্র ৯টি চিহ্ন হলেই চলে।
এখন ব্যঞ্জন বর্ণের ঘরে আসা যাক। এ ঘরে মোট ৪০টি বর্ণ আছে। যা নিম্নে দেয়া হল।
ক, খ, গ, ঘ, ঙ; চ, ছ, জ, ঝ, ঞ; ট, ঠ, ড, ঢ, ণ; ত, থ, দ, ধ, ন; প, ফ, ব, ভ, ম; য, র, ল, ব, শ; ষ, স, হ, ড়, ঢ়; য়, ৎ, ং, ঃ,  ঁ
এখানে ‘ঙ’ এবং ‘ং’ এ দুটি বর্ণের মধ্যে উচ্চারণগত কোন পার্থক্য নেই বিধায় অপেক্ষাকৃত জটিল ‘ঙ’ কে বাদ দেয়া যায়। জ, ঝ ও য এই ৩টি বর্ণের মধ্যে ‘জ’ কে বাদ দেয়া যায়। ‘ঞ’ এর ব্যবহার অত্যন্ত সীমিত বিধায় তাকে রাখার আর কোন যুক্তি নেই। ‘ণ’ ও ‘ন’ এর মধ্যে লিখার ক্ষেত্র ছাড়া পড়া এবং বলার ক্ষেত্রে উচ্চারণগত তেমন কোন পার্থক্য নেই। এক্ষেত্রে ‘ণ’ কে বাদ দিয়ে শুধু ‘ন’ কে রাখা যায়। স, ষ, ও শ এর বেলায় ‘ষ’ কে বাদ দেয়া যায়। ‘ত’ ও ‘ৎ’ এর মধ্য থেকে ‘ৎ’ কে বাদ দেয়া যায়। ‘য়’ কে ‘অ’ দ্বারা সহজেই প্রকাশ করা যায়। ‘ঢ়’ কে বাদ দিলে ভাষার কোন অঙ্গহানী হবে বলে মনে হয় না। তা হলে ব্যঞ্জনবর্ণ এসে দারাল ২৯ টিতে, স্বরবর্ণ ১টি এবং কার ৮টি সর্বমোট ৩৮টি বর্ণ বা চিহ্ন।
এখানে আরেকটি ব্যাপার লক্ষণীয়। ব্যঞ্জনবর্ণকে উচ্চারণ করতে হলে একটি স্বরবর্ণ লাগে, আর তা হল ‘অ’। উদাহরণ সরূপ বলা যায় স্+অ= স, খ্+অ=খ। আমরা বলতে গেলে হসন্ত ( ্ ) কে প্রায় বাদ দিয়ে দিয়েছি বাংলা লিখা এবং পড়ার ক্ষেত্রে। আরবী শব্দ আল্লাহ্ কে আমরা লেখি আল্লাহ।
এবার আসা যাক যুক্তবর্ণের দিকে। প্রথমে ধরা যাক যুক্তবর্ণ ‘ক্ষ’ কে। এর নাম দেয়া হয়েছে খিয় বলে। ‘ক’ এবং ‘ষ’ মিলে হয়েছে এর অবয়ব, অথচ এর মধ্যে না আছে ‘ক’ এর অস্তিত্ব, না আছে ‘ষ’ এর অস্তিত্ব। ভাগ্যিস এর একটা  নাম পেয়েছি। কিন্তু ‘হ’ ও ‘ম’ এর সমন্বয়ে যে যুক্তবর্ণটি পেয়েছি এর আকৃতি হয় ‘হ্ম’। এর একক নাম কি তা আজও জানিনা, কেউ জানে কি না সন্দেহ। এর অবয়বের মধ্যে না আছে ‘হ’ এর অস্তিত্ব, না আছে ‘ম’ এর অস্তিত্ব। যুক্তবর্ণ সম্বলিত সঙ্গীত কে লক্ষ করি। এই শব্দটির মাঝের যুক্তবর্ণটির কি নাম তা কারও জানা আছে বলে মনে হয় না। “বঞ্চিত” শব্দে যুক্ত বর্ণটিতে দেখা যায় ‘ন’ ‘ব’ এবং ‘ঞ’ এর পিঠের বোঝাটি কিন্তু উচ্চারণের মধ্যে আসছে ‘চ’ এর ধ্বনী। ‘উদ্বোধন’ শব্দটি আমরা যে ভাবে উচ্চারণ করছি সে ভাবে লিখলে হয় ‘উদ্বোধন’ কিন্তু আমরা যে ভাবে লিখে আসছি সে ভাবে উচ্চারণ করলে হয় উদোবোধন অর্থাৎ ‘ে া’ কারটি ‘দ’ এবং ‘ব’ উভয়ের মধ্যে আছে। পল্লী শব্দটিতে দুটি ‘ল’ এর মধ্যেই ‘ী’ কার আছে। সে অনুযায়ী পড়লে পড়তে হয় পলীলী। কিন্তু শব্দটির উচ্চারণ ঠিক রেখে যদি লিখি তা হলে লিখতে হবে পল্লী।
আর একটি ব্যাপার অবশ্যই যা বিবেচনায় আনা উচিৎ। বাংলাদেশের শতকরা ৮০ ভাগ এলাকা এখনও অজ পাড়া গাঁ এর অর্šÍভূক্ত। এখানে না আছে শিক্ষার অবকাঠামো, না আছে অর্থনৈতিক অবকাঠামো আর না আছে সামাজিক উন্নয়ন মূলক অবকাঠামো। সে সব এলকা সহ সমগ্র দেশে বাচ্চাদের স্কুলে ভর্তির শুরু থেকে ৮/৯ মাসের মধ্যে কয়টা ছেলে মেয়ে স্কুল ত্যাগ করছে অথবা প্রথম বার্ষিক পরীক্ষার আগে কতজন স্কুল ত্যাগ করছে এবং কি কারণে করেছে এর কোন পরিসংখ্যান কোথাও আছে বলে মনে হয় না। যদি এই ড্রপ আউট বের করার জন্য কোন জরিপ চালানো যেত এবং ড্রপ আউটের কারণ বের করা যেত তাহলে একটি বড় কারণ হয়তো পাওয়া যেত বাচ্চাদের উপর বর্ণাধিক্যের চাপ, অর্থনৈতিক চাপ এখানে মূখ্য নয়। অধিক সংখ্যক বর্ণ, নামহীন আজগুবী চেহারার যুক্ত বর্ণ, শব্দের মধ্যে উচ্চারণহীন এবং ভুল উচ্চারণের ছড়াছড়ি আমাদের বাচ্চাদের কচি মনে এক অজানা ভীতির সঞ্চার করে ফেলে। ফলে শিক্ষকের চাপ ও অভিভাবকের চাপের মুখে স্কুল পালাতে বাধ্য হয়।
এবার আসুন আমরা ফলার ব্যাপারে কিছু কথা বলি। প্রথমেই ধরি ‘পদ্মা’ শব্দটিকে। শেষের যুক্তাক্ষরটিকে আলাদা করে লিখলে শব্দটি দাঁড়ায় পদ্মা। এখন শব্দটিকে আমরা যেভাবে উচ্চারণ করি সে ভাবে লিখলে হয় পদ্দা। স্মারক, স্বাধীন ও আত্মা ইত্যাদি শব্দে ম ফলা, ব ফলার কোন উচ্চারণ নেই। আমার প্রশ্ন হল যেখানে উচ্চারণ হয় না সেখানে অক্ষরটি না লিখলে ভাষার কি ক্ষতি হবে বা কতটুকু ক্ষতি হবে তা আমার মাথায় আসে না। অনেকে অন্য ভাষার কথা উল্লেখ করবেন। ইংরেজী ভাষাতে একটি শব্দ আছে ঈড়ষড়হবষ এর উচ্চারণ হবে কর্ণেল। এতে ইংরেজী ভাষায় কি ক্ষতি বা লাভ হয়েছে তা তারা দেখুগ্যে। আমাদের এ ধরনের জটিলতার মধ্যে যাওয়ার দরকার কি ?
সারসংক্ষেপ :
বাংলা ভাষায় বর্তমানে স্বরবর্ণ ১১টি, ব্যঞ্জণবর্ণ ৪০টি, কার ১০টি মোট = ৬১টি
বিশ্লেষণ অনুযায়ী কমালে স্বরবর্ণ ১টি, ব্যঞ্জণবর্ণ ২৯টি, কার ৮টি মোট = ৩৮টি
আমাদের বাচ্চাদের ৬১টি বর্ণ ও কার শিখতে যত সময় লাগবে তার চাইতে ৩৮টি বর্ণ ও কার শিখতে সময় লাগবে এর অর্ধেক। উদ্ভট নামহীন যুক্তবর্ণ এবং শব্দে অনুচ্চারিত অক্ষরগুলো বাদ দিলে আরও সময় কমে যাবে। ড্রপ আউট এর পরিমান কমে যাবে। শিক্ষার হার বেড়ে যাবে। জাতীয় সময় বাঁচবে এবং সামগ্রিক ভাবে জাতি উপকৃত হবে বলে মনে করি।
Next Post
No Comment
Add Comment
comment url