চিড়িয়াখানাকে না বলুন

ভাবুন তো আপনার জীবনের কোনও একটি দিক নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না আপনি! কল্পনা করুন - আপনি কখন খাবেন, আপনি কী খাবেন, কখন আপনি ঘুমাবেন, আপনি কোথায় যেতে পারবেন বা কাকে নিয়ে আপনি একটি পরিবার শুরু করবেন কোনোটাই আপনার ইচ্ছায় হবে না।  চিড়িয়াখানার প্রাণীদের জন্য এটিই বাস্তবতা, যারা জীবন্ত প্রদর্শনীতে রূপান্তরিত হয়।  চিড়িয়াখানায় কিছু প্রাণীকে খুব ছোট ঘেরের মধ্যে আবদ্ধ রাখা হয়, কেউ কেউ জীবনের নিষ্ঠুরতার কাছে হার মেনে অবজ্ঞাপূর্ণ কৌশল বা অঙ্গভঙ্গি করতে বাধ্য হয়। বঙ্কিমের বিড়ালের মতো তারাও আমাদের ব্যাঙ্গ করছে না তো এভাবে? এমনকি সেরা চিড়িয়াখানাতেও, সর্বোত্তম ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও হোকনা সেটা সাফারি পার্ক, বন্দিজীবন বন্য প্রাণীদের জন্য মোটেই সুখের জীবন নয় কিংবা হয়তো জীবনই নয়!

চিড়িয়াখানা দেখে আপনি হয়তো ভাবতেই পারেন যে এগুলিই বুঝি তাদের ঘর এবং বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির বেশিরভাগ এর মধ্যে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এতে তারা নিরাপদে আছে বা সুখে আছে!! আসলে যে তা নয়! হাজত কারো বসত-ভিটা হতে পারে না!!

বন্য অঞ্চলে, প্রাণী কয়েক শ মাইল ঘোরাফেরা করতে পারে, শিকার করতে পারে নিজ প্রয়োজনে, তাদের বাচ্চাদের বড় করতে, খুঁজাখুঁজি করতে, খেলতে এবং মধুর সামাজিক সম্পর্কটাও উপভোগ করতে পারে। তবুও চিড়িয়াখানায় তাদের জীবন চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ।  আবদ্ধকরণের ফলে এবং স্বাভাবিক উদ্দীপনার অভাবে প্রায়শই অস্বাভাবিক এবং স্ব-ধ্বংসাত্মক আচরণ করে। আর চিড়িয়াখানা রক্ষকরা মাঝে মাঝেই এসব প্রাণীদেরকে অ্যান্টি-ডিপ্রেশন, ট্র্যানকিলাইজার বা অ্যান্টি-সাইকোটিক ড্রাগ দিয়ে ঝামেলাগুলো আড়াল করার চেষ্টা করে।

অনেক চিড়িয়াখানাতে বয়োবৃদ্ধ বা উদ্বৃত্ত প্রাণীকে হত্যা করে বা অনৈতিকভাবে বহিরাগত-পশু ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে বিষয়টি "নিষ্পত্তি" করারও দৃঢ় প্রমাণ রয়েছে। এর ব্যতিক্রম থাকলে থাকতেও পারে তবে তাও প্রশংসনীয় নয়। কাউকে বন থেকে কেড়ে এনে বনে ফিরিয়ে দেওয়াতে বাহাদুরি কিসের? এতো অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত। 

একটি ব্রিটিশ চিড়িয়াখানায় বেবুন এবং বিপন্ন হরিণ সহ জবাই করা প্রাণীর মৃতদেহ ডালের পাশে পঁচাবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছিল। কলকাতার চিড়িয়াখানা খাদ্যের অভাবে সিংহের দুর্ভোগ কিংবা বাঘিনী কল্পনার করোনা ভাইরাস হওয়া অথবা জার্মানির উত্তর পশ্চিম অংশের ক্রেফিল্ড চিড়িয়াখানাতে মানুষের নামক প্রাণীর উড়ানো ফানুশের আগুনে ৩০ টি গরিলা, শিম্পাঞ্জি ও বানরের মৃত্যুর দায় কি আমরা এড়াতে পারবো?

কিছু চিড়িয়াখানায় লজ্জাজনক অবহেলার ঘটনাও রয়েছে, পশুপাখিদের অনুর্বর বা বন্ধ্যা করে রাখা হয়েছে, অবিচ্ছিন্ন পানীয় জলের সাথে নোংরা ঘের রয়েছে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের আদি নিবাসের মতো রূপ দেওয়ার চেষ্টাও করা হয়নি।  তবে এটি সম্ভবত অবাক হওয়ার মতো বিষয় নয় যে হতাশ প্রাণীরা পালানোর চেষ্টা করছে এমন অনেকগুলি উদাহরণ রয়েছে, যার মধ্যে মাঝে মাঝে অনেকগুলোর করুণ পরিণতি হয়।  উদাহরণস্বরূপ, ২০১২ সালে কোলন চিড়িয়াখানায় একটি বাঘ তার ঘের থেকে পালিয়ে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গিয়েছিল[১][২][৩][৪], অন্যদিকে চেক প্রজাতন্ত্রের আরও একটি বাঘ পালিয়ে গিয়ে চিড়িয়াখানার তিনজন কর্মচারীকে মেরে ফেলেছিল।  ষাঁড়, শিম্পাঞ্জি এবং লেমুররা হলো এমন কিছু প্রাণী যা সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের চিড়িয়াখানা থেকে পালানোর চেষ্টা করেছে, তারা বুঝাতে চাচ্ছে যে তারা কতটা অসুখী এখানে, তারা তাদের স্বাধীনতা ফিরে পেতে কতটা মরিয়া। কেন আমরা বুঝতে পারছি না? 

বিপন্ন প্রজাতিকে সাহায্যের উদ্দেশ্য থাকলে একমাত্র কার্যকরী এবং টেকসই উপায় হলো তাদের প্রাকৃতিক বাসস্থান রক্ষা করা, তবে চিড়িয়াখানার বিশাল ব্যয়বহুল প্রজনন কর্মসূচিগুলো আসল সংরক্ষণ প্রকল্পকে ল্যাং মেরে কেবল অর্থবিনাশ করছে যার আদৌ প্রয়োজন ছিলো না।  সর্বোপরি, যদি তাদের কোনও ঠিকানা না থাকে তবে তাদের প্রজনন করার বিষয়টি কী? কেন একজন মা তার অনাগত সন্তানকে এ খাঁচায় প্রসব করবে? কেন? কেন?

চিড়িয়াখানা পরিদর্শন করবেন না দয়া করে!  এই অমানবিক স্থাপনাগুলি থেকে আপনার অর্থ আটকে রাখুন যা প্রাণীদের শোষণ করেই লাভ করে।  আমরা প্রাণী কারাগার নয়, আবাসস্থল সংরক্ষণকে সমর্থন করে বিপন্ন প্রজাতিগুলিকে রক্ষা করতে পারি।

আপনি চিড়িয়াখানায় কেন যান? বিনোদনের জন্য হলে আপনার জন্য একরাশ সমবেদনা আর স্মরণ করিয়ে দিবো পৃথিবীতে আমরা কেউ কারো বিনোদনের পাত্র নই। বাস্তুতন্ত্রে বিনোদনের স্থান নেই। শূকর, শিয়াল, কুকুর যেটাই হোক তারা আমাদের সহচর, মহাবিশ্বের ময়দানে আমাদের সঙ্গী। তাদের উপর আমাদের কোনো অধিকার নেই। যা আছে তা কেবলই অনিবার্য। 

আর যদি বলেন সেখানে জ্ঞান অর্জনে বা শিখতে যান তাহলে প্রথমেই জিজ্ঞেস করবো কী শিখেছেন? কি এমন আছে সেখানে শিখার। চিড়িয়াখানাগুলি খুব কমই শিক্ষামূলক - তারা যে খাঁচা, নিঃসঙ্গ প্রাণী তাদের বসতি প্রাকৃতিক প্রেক্ষাপট থেকে এতটা দূরে সরে গেছে যে তাদের নিজ প্রবৃত্তিগুলোও পূরণ বা পালন করার সুযোগ তাদের খুব কমে গেছে। এই দুঃখজনক সুবিধাগুলিতে কেবল শিখার বিষয় হলো যে প্রাণীগুলি সীমাবদ্ধ থাকাকালীন কীভাবে মুক্ত হওয়ার জন্য  ছটফট করছে।

দিন শেষে চিড়িয়াখানাগুলি বিনোদনের দিকেই মনোনিবেশ করে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়।  তারা মানুষকে যা শিখিয়েছে তা হলো প্রাণীদের জীবনে হস্তক্ষেপ করা এবং তাদের বন্দিদশায় আটকে রাখা মেনে নেওয়া যায়, অথচ এতে যে তারা বিরক্ত, বাধাপ্রাপ্ত, একাকী হয়ে গেছে এবং তাদের জীবনের উপর থেকে সমস্ত নিয়ন্ত্রণ থেকে বঞ্চিত হয়েছে সেকথা ভুলে যাওয়াটা আমাদের কিধরনের জ্ঞান অর্জন? 

অদেখা বাঘকে জানার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ার উদ্দেশ্য যদি হয় আপনার জ্ঞান অর্জন, তাহলে আপনার পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া কুকুরটার প্রতি কখনো লক্ষ্য করেন নি কেন? কেন তার দিকে ঘৃণার চোখে তাকান? কেন শিয়াল দেখলেই তাড়িয়ে বেড়ান?

আপনি যদি প্রাণী সম্পর্কে জানতেই চান তবে প্রাকৃতিক ডকুমেন্টারি দেখুন যাতে দেখায় যে প্রাণীগুলি তাদের প্রাকৃতিক আবাসে কীভাবে আচরণ ও বিচরণ করে।  বা আপনার চারপাশে তাকান!  আপনার বাগানের পোকা থেকে শুরু করে মাথার উপরক উড়ন্ত পাখিগুলিকে চিনুন, জানুন, বুঝুন। আপনার চারপাশে থাকা স্থানীয় অঞ্চলের বন্যজীবনের বিশেষজ্ঞ হোন।

আর হ্যাঁ, সুদূর ভবিষ্যতে যদি এমনটা হয় যে বিশ্বের সমস্ত চিড়িয়াখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছে এবং ভার্চুয়াল হলোগ্রাফিক চিড়িয়াখানা এর জায়গায় প্রতিস্থাপিত হয়েছে, তবে কেমন হবে বিষয়টা? আমি ভাবতেই পুলকিত হই। বিগত দুবছর যাবত আমি চিড়িয়াখানা বন্ধের কথা ভেবে আসছি। স্বপ্ন দেখি একদিন বন্ধ হবে। হয়তো এটাই সময় আমাদের চিড়িয়াখানা বন্ধের আওয়াজ তোলার। প্রযুক্তির সদ্ব্যবহারে আমরা কাজটা করতেই পারি।

আসুন বলি,

আর কোনো খাঁচা নয় বা/or No More Cages জগতের সকল সত্ত্বা সুখী হোক।

#চিড়িয়াখানাকে_না_বলুন

#Say_no_to_zoos 

তথ্যসূত্র

  1. https://phys.org/news/2012-08-tiger-german-zoo-woman.html
  2. https://www.dailymail.co.uk/news/article-2193505/Cologne-Zoo-Female-zoo-keeper-killed-tiger-escaped-enclosure-gate-wasnt-closed-properly.html
  3. https://www.bbc.com/news/world-europe-19380140
  4. https://www.theguardian.com/world/2012/aug/25/tiger-shot-escaping-killing-zookeeper
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url